গড়া কঠিন ভাঙ্গা সহজ
অনেক দিন আগের কথা। ১৯৮০ সালের দিকে হবে হয়তো। আমি প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র। বাড়ির অন্য ছেলে-মেয়েদের সাথে স্কুলে যাই-আসি। বাড়ি থেকে স্কুল বেশী দূরে নয়। গ্রামের কাঁচা রাস্তা। দুপাশে গাছের সারি। ডোল কলমি আর কলা গাছও। ওরা আমাদের ছাত্র ছিলো! স্কুল হতে বাড়ি ফেরার পথে কতক ছাত্র ওদের পড়া ধরতো। ঠিক শিক্ষকের মতো। না পারলে বেদম পেটাতো। সত্যিকারের শিক্ষকের মতো।
হেমন্তের সকাল। ক্ষেতে আধা-পাকা
ধান। বাতাসে ঢেউ খেলায়। অতি মনহারি দৃশ্য! চমৎকার! এরকমই এক সুন্দর দিনে স্কুলে যাচ্ছি।
একটু দেরীতে। অন্যেরা চলে গেছে, আমি একা। হাতে বই-খাতা, পকেটে কলম। হাঠাৎ পথের পাশে
ধান ক্ষেতে চোখ আটকে গেলো! কয়েকটি ধানের গোছা নড়ছে। বেজি, কুকুর-বেড়াল, ইঁদুর কিছু
একটা হবে হয়তো। দাঁড়িয়ে গেলাম। একজন বয়স্ক মানুষ বসে আছেন। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিচ্ছেন!
চোখা-চোখি হলে তিনি দুহাঁটুর মাঝে মুখ লুকানোর চেষ্টা করেন। দ্রুত পায়ে স্কুলের দিকে
ছুটলাম! দেরী হয়ে যাচ্ছে।
গ্রামে কারো-কারো কাঁচা-পাকা থাকলেও অনেকেরই ছিলোনা। তারা যত্র-তত্র মল-মুত্র ত্যাগ করে। শৌচকার্যে উম্মুক্ত জলাশয়ের পানি ব্যবহার করে। দুষিত পানি। দুর্গন্ধময় চারপাশ। সব ঘরে অসুখ-বিসুখ লেগে আছে। নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা। গ্রামের একমাত্র পল্লী চিকিৎসক আধসের বিশুদ্ধ পানিতে লবন-গুড়ের খাবার স্যালাইন বানানো শেখালেন। কেউ-কেউ বানাচ্ছে, খাচ্ছে। যদি একটি পাকা টয়লেট থাকতো! অনেক টাকার ব্যাপার।
এসএসসি পরীক্ষা শেষ। অলস সময়
পার করাই বড় কাজ। কি ভাবে টাকা জোগাড় করা যায় ভেবে কুল-কিনারা পাচ্ছিনা। বাড়ির সম-বয়সিদের
নিয়ে সমিতি করে কিছু টাকা জমেছে। টয়লেট বানানোর টাকার তুলনায় অনেক কম! বাড়ির পুকুরে
মাছের চাষ করলে কেমন হয়। বন্ধুদের সাথে শেয়ার করলাম। কাজ শুরু করলাম। মাছ বিক্রি করা
টাকা, নিজের জমানো টাকা আর সমিতির অল্প কিছু টাকা একত্র করলাম। টয়লেটের সেপটিক ট্যাংক
হবে একজনের জমিতে আর অন্যজনের জমিতে হবে দুকামরা বিশিষ্ট পাকা টয়লেট। কাজ হবে স্বেচ্ছা
শ্রমের ভিত্তিতে। ইট, সিমেন্ট আর রড কিনতে হবে। কিন্তু জমির মালিকগণ রাজি নন।
অবশেষে সর্বজনের স্বার্থ বিবেচনায় রাজি হলেন। মরহুম বেচু মিয়ার নেতৃত্বে স্বেচ্ছা শ্রমের ভিত্তিতে সেপটিক ট্যাংকের মাটি খননের কাজ শুরু হলো। ইট, সিমেন্ট আর রড কেনা হলো। সেপটিক ট্যাংকের কাজ শেষ। ইউজার বেশী বিধায় দুকামরা লাগবে। টয়লেটের ছাদ হলো। সম্ভবত ১৯৮৯ সালে কাজ শেষ হয়। কাজটি হয়তো ছোট মানুষের ছোট কাজ কিন্তু ফিলোসফিটা তো ছোট ছিলোনা। ফিলোসফিটা ছিলো জনহিতকর।
স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটটি চালু করার পর আবালবৃদ্ধবনিতা বিশেষ সুবিধা পায় পূর্বে ছিলোনা। রাস্তায় মল-মূত্র পড়ে থাকতে দেখা যায় না। জলাশয়ের পানি দূষিত হয় না। চলা-ফেরা করতে দূর্গন্ধ লাগে না। সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় পরিবেশ পাল্টে যায়। অসুখ-বিসুখের প্রকোপ কমে যায়। একটা স্বাস্থ্যসম্মত বিরাজ করে।
এখন ২০২২ সাল চলছে। এদেশের সব মানুষের জন্য কি টয়লেট নিশ্চিত করা হয়েছে? শতভাগ সেনিটেশন কি সম্ভব হয়েছে? এসডিজি অর্জিত হলে হবে হয়তো। অপেক্ষা করতে হবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত, তাও আবার বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকলে।
২০৩০ সাল নাগাদ সাত কোটি ২০
লাখ মানুষকে উন্নত সেনিটেশন সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতা করছে
ইউনিসেফ।
শিশু, বিশেষ করে সবচেয়ে ঝুঁকিতে
থাকা শিশুদের অধিকার রক্ষায় সরকার ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে ইউনিসেফ ও সচেতন জনসাধারণ।
জরুরি পরিস্থিতিতে যখন শিশু
ও কিশোর-কিশোরীরা সবচেয়ে নাজুক ও ঝুঁকিপূর্ণ, সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকে তখন তাদের নিরাপদ
সেনিটেশন ও হাইজিন সেবা দিতে কাজ করে এই জাতিসংঘ সংস্থা।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে
সামঞ্জস্য বিধান করে বহুমুখী পদক্ষেপ নেয় ইউনিসেফ। শহর ও গ্রামাঞ্চলের পাড়া-মহল্লার
পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও
হাইজিন সেবার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে ইউনিসেফ ও সচেতন
জনগন।
অনিরাপদভাবে আশপাশে মল-মূত্র
ছড়ানো রোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও সবাই সমান সুযোগ পায়, এমন পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা
গড়ে তুলতে সেনিটেশন ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজ করে ইউনিসেফ ও সচেতন জনগন।
হাইজিন বিষয়ে চার ক্ষেত্রে
মানুষের অভ্যাস বদলের ওপর গুরুত্ব দেয় ইউনিসেফ। এগুলো হল- সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, নিরাপদ
পানি, ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতা আর মল-মূত্রের নিরাপদ অপসারণ।
স্কুলগুলোতে নিরাপদ পানি, সেনিটেশন
ও পরিচ্ছন্নতার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলে শিক্ষার্থী ভর্তি, উপস্থিতি, লেখাপড়া
শেষ করার হার এবং প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণের দিক দিয়ে উন্নতি হয়।
স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে মায়ের
সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার মতো পরিচ্ছন্নতার নিয়ম মেনে চলায় নবজাতকের মৃত্যু ৪৪ শতাংশ এবং
শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
এইডস আক্রান্ত ব্যক্তি এবং
তাদের সেবাদাতাদের জন্যও মানসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং হাইজিন অত্যন্ত জরুরি।
স্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে নিরাপদ পানি সরবরাহ রোগীদের
জীবাণু সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয় এবং তার জীবনমানের উন্নয়ন ঘটায়।
ইউনিসেফের কার্যক্রমে নারী
ও মেয়েদের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তাদের ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতার স্বাস্থ্যকর
ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে পয়ঃনিষ্কাশনের পর্যাপ্ত
অবকাঠামো এবং নারী ও মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেটের ব্যবস্থা, লেখাপড়া শেষ করার হার,
বিশেষ করে কিশোরীদের শিক্ষা সমাপনীর হার এবং বিয়ের বয়স বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলাফল
আনে।
ব্র্যাকের একটি গবেষণায় দেখা
গেছে, স্কুলে মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেট থাকায় ক্লাসে তাদের উপস্থিতি ১০ শতাংশ পয়েন্ট
বাড়ে এবং বিশেষ সময় সেগুলো ব্যবহারের সুযোগ থাকলে উপস্থিতি বাড়ে ২০ শতাংশ পয়েন্ট।
বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের
জন্য জাতিসংঘ নির্দেশিত এসডিজি অর্জন যদি করতে হয়, তাহলে সকল মানুষের জন্য মানসম্মত
পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একটি
অন্যতম লক্ষ্য। আসুন আমরা সকল সচেতন নাগরিক সরকারের এ লক্ষ্যকে সফল করায় সর্বাত্মক
সহযোগীতা করি।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের এ সকল লক্ষ্য অর্জনে একটি মহল বাধা প্রদান করছে। বিভিন্ন স্থানে টয়লেট ভেঙ্গে ফেলছে। মানসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্থ করছে। তারা মানুষের ক্ষতি করছে। এটা কোন ভাবেই কাম্য হতে পারেনা। যে বা যারা এসকল টয়লেট ভাঙ্গছেন তাদের মনে রাখা দরকার- ’’গড়া কঠিন ভাঙ্গা সহজ।’’ ব্যক্তিগত ভাবে অনেকে এরচেয়ে আরো বড়-বড় কিছু করতে পারে কিন্তু সামগ্রিক ভাবে সোসাইটির জন্য কিছু করাটা তারচেয়ে বড়। সোসাইটির সামগ্রিক পরিবর্তন হলে ব্যক্তির পরিবর্তন হবেই। আর সেটিই প্রয়োজন।
করণীয়ঃ
১। জনস্বার্থে অনতিবিলম্বে
ভাঙ্গা টয়লেটগুলো মেরামতের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
২। এসডিজি অর্জনে গণপ্রজাতন্ত্রী
বাংলাদেশ সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগীতা করা।
