ভাটিবাংলার ছড়া ও প্রবাদ-প্রবচন
উত্তমকুমার রায়
নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ থানাশহর থেকে পল্লিঅঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে লোকসাহিত্য। এ-লোকসাহিত্য হচ্ছে এখানকার পাড়াগাঁ, হাওর এলাকার সাধারণ মানুষের সম্পদ। এ-সম্পদ একদিনে তৈরি হয়ে ওঠেনি। শত শত বছর আগে থেকে এগুলো নানারূপ পরিবর্তনে- কখনো সংযোজিত, কখনো বিয়োজিত, সংশোধিত হয়ে এই আকারে এসে পৌঁছেছে। এগুলোর মাঝে লুকোনো রয়েছে ভাটিবাংলার পূর্বপুরুষদের ভাবনা-চিন্তা, আনন্দ-বেদনা, মিলন-বিরহ, সাধ-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এ-অঞ্চলের লোকসাহিত্যের অফুরন্ত ভাণ্ডারের অনেক সম্পদই হারিয়ে গেছে কালের আবর্তে। লোকসাহিত্য ভাণ্ডারের ছড়া, হেঁয়ালি বা ধাঁধা, কেচ্ছা, প্রবাদ-প্রবচন এখানকার শিশুদের কাঙ্ক্ষিত বস্তু। শিশুদের প্রথম পরিচয় ঘটে বহু বছর আগে অশিক্ষিত গ্রাম্য-কবিদের দ্বারা তৈরি এ-সম্পদের সাথে। শিশুরা আহার-নিদ্রা ভুলে যায় বুড়ো-বুড়িদের কাছ থেকে এগুলো শোনে। আমাদের এ শিশু-কিশোর-কিশোরীরাই এ-সম্পদকে টিকিয়ে রেখেছে নিজেদের অজান্তেই।
ছড়া
কংশ নদের তীরে অবস্থিত ভাটিবাংলার জনপদ এ অঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, আবেগ-অনুভূতি, মিলন-বিরহ, প্রেম-প্রীতিসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিচিত্র সমাবেশ ঘটেছে ছড়ায়। ছড়ার মাধ্যমে এখানকার লোকজনের চাল-চলন, রীতি-নীতি উপলব্ধি করা সম্ভবপর। ছড়ার কথা বললেই শিশুদের কথা এসে পড়ে। এখানকার শিশুদের হাতেখড়ি ঘটে ছড়ার মাধ্যমে। অল্প সময়েই শিশু-কিশোর-কিশোরীরা ছড়াগুলো মুখস্থ করে ফেলে। সমাজ বা পরিবেশ থেকে নিজে নিজেই ওরা এগুলো শিখে নেয় আর কথায় কথায় সময়ে অসময়ে ছড়া কাটে। তাৎক্ষণিক সৃষ্টি করতেও দেখা যায়। ঘুমপাড়ানো ছড়া, খেলাধুলোবিষয়ক ছড়া, কৌতুকপ্রধান ছড়া, স্কুলকেন্দ্রিক ছড়া, শিশুভুলানো ছড়া, জামাইঠকানো ছড়া, সংসারবিষয়ক ছড়াসহ বিবিধ রকমের ছড়া এখানে প্রচলিত আছে। কিছু কিছু ছড়া অশ্লীলতার দোষে দুষ্ট। তবু ছড়া আমাদের আনন্দ দেয়। অশিক্ষিত সেই গ্রাম্য-কবিদের সৃজনশীলতার সহিত পরিচয় ঘটায়। এর মাধ্যমে জানা যেতে পারে পূর্বসূরীদের চিন্তা-ভাবনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখ, প্রেম-প্রীতির ইতিহাস।
খেলাধুলোবিষয়ক ছড়া
ফুলগুটি খেলা
পাঁচগুটি দিয়ে বিশেষ করে ছোটো ছোটো মেয়েরা 'ফুলগুটি খেলায় এ ছড়াটি পড়ে থাকে, খেলার মধ্যে এটি মেয়েদের একটি প্রিয় খেলা-
ফুল না ফুল না ফুল না
এক হাতে দুল না-তেল না
সুষম সুষম সুষম
আঁটি আঁটি আঁটি
লঙ্গ না লঙ্গ না লঙ্গ না
একটি পয়সা তেলের দাম
মনুরঞ্জন ব্রাহ্মণ
পদে ব্রাহ্মণ পদে বাঁশি
এই সূর্য তুমি সাক্ষী
সারি মোল্লা গেছ পাট্টি
তুলছে পাট্টি।
থাপ্ ড়ি খেলা
এক গুটি ব্যবহার করে শিশুরা এ খেলা খেলে
থাকে-
থাপপি এক থাপপি দুই থাপপি তিন
থাপপি চার থাপপি পাঁচ থাপপি ছয়
ছয়ে লয় আল বয়
আলের গুডি ডাল বয়
চাক চাক কুমড় চাক
নয়া বাড়ির নয়া চাক
হরু ফুল ক্ষেত ধান
থাপ্ পি দিলাম এক খান।
লুকোচুরি খেলা
এ-খেলায় একজনের দুচোখ অপর কেউ হাত দিয়ে ধরে রাখবে এবং যে চোখ ধরেছে সে ছড়া কাটবে। অপর সকলেই তার কপালে আঙুল দিয়ে টোকা মেরে যে যেখানে পারে আশেপাশেই গিয়ে লুকোবে। তারপর যার চোখ বন্ধ ছিল সে সকলকে একে একে খুঁজে বের করবে। ছড়াটি এই -
চোউখ পলান্তি লোহার কাডি
বলরে ভাই সকল কাডি
রাজার পিছে থাকে যে
ব্যাঙ ভাজা খায় সে
চোর ছুটল ছুটল ছুটল।
গাচ্ছ্যা ও বাঘ খেলা
এটি একটি বেশ মজার খেলা। এ-খেলায় দুটো পক্ষ থাকে। এক পক্ষের সকলেই গাছে চড়ে এবং অপর পক্ষের শুধু একজন বাঘ হয়ে মাটিতে একটি নির্দিষ্ট রেখার কাছে অপেক্ষা করে। যারা গাছে চড়েছে তাদের সকলেই গাছ থেকে নেমে বাঘকে ফাঁকি দিয়ে মাটিতে অঙ্কিত ওই নির্দিষ্ট রেখা অতিক্রম করতে চেষ্টা করে। এ-সময়ে বাঘ তাদের যে কোনো একজনকে ধরার চেষ্টা করে। যদি ধরতে পারে তা হলে বাঘ গাছে চড়বে এবং যাকে ধরেছে সে বাঘ হবে। এভাবে ছেলেমেয়েরা এ-খেলা খেলে থাকে।
গাচ্ছ্যা রে ভাই গাচ্ছ্যা
- কিরে ভাই গাচ্ছ্যা।
গাছে উঠছস কেরে?
- বাঘের ডরে।
বাঘ কই?
-মাডির তলে।
মাডি কই?
-শূন্যে।
তরা কয় কুড়ি, কয় ভাই?
-সাত কুড়ি সাত ভাই।
এক ভাই দিবে?
-ছৈতাল্লে নিবে।
একগুটি খেলা
একগুটি ব্যবহার করে ছেলেমেয়েরা এ-খেলাটি করে থাকে। নির্দিষ্টসংখ্যক ছেলেমেয়ে এ-খেলায় অংশগ্রহণ করে। তাদের মধ্য থেকে বিশেষ একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজনকে 'কাউয়া' নির্বাচিত করে খেলার বিপরীতমুখী করে কাউয়াকে দাঁড়াতে হয়। অপর একজন ছড়াপাঠের সাথে সাথে গুটি চালনা করে খেলায় অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেকের গায়ের কাপড়ে । ছড়াপাঠ শেষ হলে বিপরীতমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা 'কাউয়া'কে যার কাছে গুটি রাখা হয়েছে তাকে সনাক্ত করতে হয়। ছড়াটি হলো :
উকুনীর মা লো জুকুনী
ফুল টুকাইতে যাইবানি
ফুলের নাম দেবী
আরশিঘরের পরশিখান
দুই দুয়ারের মন্দিরখান
রাজার গুডি রাজার টাইন
কও কাউয়া গুডি কার টাইন।
হাডুডু বা বৌচি খেলা
বৌচি কিংবা হাডুডু খেলায় এক দম (শ্বাস) নিয়ে এক শ্বাসে ছড়া বলে থাকে। ছড়াগুলোকে এ-খেলার বোল বলা হয়।
॥ ১৷৷ হাডুডু লাই তবলা বাজাই
তবলার সুরে গুন গুন করে,
গুন গুন করে, গুন গুন করে ৷
।।২৷। চল্ কপাটি বৃন্দাবন
ঘড়ি বাজে ঠন ঠন
ঘড়ির লাফে
তউরাল কাঁপে
তউরালে ঝিকিমিকি
বাওইয়া নাচে।
।। ৩।। চিক চিক চিন ফোঁটা
রক্ত ঝরে ফোঁটা ফোঁটা
রক্তের ধাপে তউরাল কাঁপে
তউরালের চুটে বাওইয়া নাচে।
॥ ৪॥ হাডুডু ডু কলের গাড়ু
নাইচ্যা মধু খায়রে।
॥৫॥ কলাগাছের ডাগগুয়া
বেডা অইলে আগগুয়া।
॥৬॥ উত্তরে জমজন দক্ষিণে বিয়া
ধরছে নাইরকল ঝুমকা দিয়া
খাব নাইরকল চিড়া দিয়া।
।। ৭।। আমি গেছলাম পুবে
বাঁশ কাটি কুবে
বাঁশের নাই আগ
আমার নাম ধইরা বাগ।
॥৮॥ আমি যাইতাম ঢাকা
পথটা বাঁকা
উপ্ রে দিয়া চাইয়া দেখি
ফুলের ঝাঁকা।
॥৯॥ আমি গেলাম গৌরীপুর
দেইখ্যা আইলাম দুই চোর
দুই চোরে বেড়া ভাঙ্গে
ধাপ্পুর ধুপ্পুর।
॥ ১০৷৷ উতি নারে দুতি না
তিন দিন ধইরা মুতি না
তিন দিনের জ্বরে
মাথা বিষ করে...।
॥ ১১৷৷ লাউগের মাথা লেখ লেখ
ঘোড়া খাইল ধানক্ষেত।
৷৷ ১২৷৷ অ্যাতাইয়ারে ব্যাতাইয়া
লাউপাতা চেতাইয়া
কুমড়াপাতার ডুগ ডুগ
খারে মাইনকার পুত।
এ-খেলায় ছেলেমেয়েদের মধ্য হতে দুজন হাত উঁচু করে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুজনের হাত দ্বারা গেট বা তোরণ তৈরি করে এবং এ-ছড়াটি কাটতে থাকে। অন্য সকলে তখন একজন আরেক জনের কাঁধে হাত রেখে শিকল তৈরি করে গেট বা তোরণের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে। যার ভাগ্যে 'ফুলের মালা' শব্দটি জুটে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন গেট বা তোরণের হাত একটু নিচু করে তার গলায় হাতের বেড় দিয়ে আটকিয়ে ফেলে। অর্থাৎ হাত দ্বারা তৈরি এ ফুলের মালা তার গলায় পড়িয়ে দেয়। এভাবে খেলাটি চলতে থাকে। এটি একটি বহুল প্রচলিত ছড়া।
ওপেনটি বাইস্কোপ
নাইন টেন তেইশকোপ
সুলতানা বিবি আনা
লাট্টুবাবার বৈঠকখানা
লাট বলেছে যেতে
পান-সুপারি খেতে
পানের আগায় মরিচ বাটা
ইস্কুল ঘরের চাবি আঁটা
যার নাম রেণুবালা
গলায় দিলাম ফুলের মালা।
মেয়েরা শিশুদের ঘুমপাড়ানোর জন্য হাঁটুর নিচে শিশুকে শুইয়ে দিয়ে ছড়াকাটার তালে তালে পা দুটো নাড়াচাড়া করে থাকে-
গুংগিল গুংগি কই গেচলে?
-পুবে গেচলাম।
পুবে কেরে?
-ধানক্ষেত।
ধান কেমন?
-ছরা ছরা।
চাউল কেমন?
-বউল্লার পাঁখ।
তর বৌয়ে ভাত দেয় না?
-না।
ডেউয়া দিয়া বাইরাইতা ফারচ না?
-না।
তর নাম কিতা?
-উইল্ল্যা বিলাই।
তর বৌয়ের নাম কিতা?
-মাইট্যা কড়াই।
তর হউরের নাম কিতা?
-হরাই গরাই।
দুধের গাঙ্গ পড়বে,
না মুতের গাঙ্গ পড়বে,
না মধুর গাঙ্গ পড়বে?
যে কোনো একটি বললে হাঁটুর উপর থেকে শিশুকে হাতের বামে বা ডানে ফেলে দেবে।
শিশুদের ঘুমপাড়ানোর ছড়াও প্রচলিত আছে; সেই ছড়ায় বর্গীদের খাজনা না-দিয়ে একান্ত আপনজনকে কিছু উপহার দেওয়ার ছবি ফুটে ওঠেছে।
আবু ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দিব কিসে? কিসের মাসি কিসের পিসি কিসের বৃন্দাবন?
চতুর্দিকে চাইয়া দেখি মা বড় ধন
মারে দিলাম শঙ্খ,শাড়ি বাবারে দিলাম ঘোড়া পিসিমারে আইন্যা দিলাম ইলশা মাছের ঝুরা।
কথোপকথনে শিশু বা কিশোর-কিশোরীরা একে অপরকে ঠকানো বা ক্ষেপানোর চেষ্টা করে। যেমন-
॥১॥ আমি একটা কতা কইতাম
কী কতা?
-ব্যাঙ্গের মাতা।
কী ব্যাঙ?
-কুণো ব্যাঙ
কী কুণো?
-বামুন কুণো।
কী বামুন?
বট বামুন।
কী বট?
-চাও বট।
কী চাও?
-গু খাও।
।৷ ২৷৷ ক ছে ডাবা
-বাইদ্যা বেডা তর বাবা।
।। ৩।। এ চড় আর দে চড়
এ চড় গেছে বাজার
রইল কেডা?
- দে চড়।
প্রশ্নকর্তা তখন উত্তরদাতার গালে চড় বসিয়ে দিতে চেষ্টা করে।
।। ৪।। ক ছে ধূপতি
-গুইও মার গা ভক্তি।
॥৫॥ ক ছে পাডা
-গুইও মার গা চাডা।
॥৬॥ ক ছে কছেন কছেন
-এই গুডা ত তুইল্যা খাছেন।
॥ ৭৷৷ ক ছে ডাইল
-তর বিয়া কাইল ।
॥৮॥ ক ছে ম্যাচ
-তর বিয়া শেষ।
॥৯॥ ক ছে চিক
-তর বিয়া ঠিক।
।। ১০।। ক ছে গাড়ির তলে সাপ
-ড্রাইভার তর বাপ।
।।১১।। ক ছে আম পাতা টং টং
-পায়খানার তলে নিমন্ত্রণ।
।।১২৷৷ ক ছে সাপের গাতা
-মরা মাইনষের পুটকি আতা।
।।১৩।। ক ছে দেউরি
-বাইদ্যা বেডি তর হউরি।
।।১৪৷৷ ক ছে আলমারি
-তর মারে লইয়া দৌড় মারি।
।।১৫৷৷ গাছের আগা লড়ে না গুঁড়ি লড়ে?
-ছের ছেইরা গু তর মুহ পড়ে।
।।১৬৷৷ বেতারযন্ত্র কে আবিষ্কার করেন? -মার্কোনি।
উত্তর দেওয়ার সাথে সাথেই প্রশ্নকর্তা উত্তরদাতাকে কনুই দিয়ে বারবার আঘাত করতে থাকে।
শিশু বা কিশোর-কিশোরীদের আসরে যে অপানবায়ুত্যাগ (বাতকর্ম) করে তাকে ছড়াকাটার মাধ্যমে সনাক্ত করা হয়-
এডি পেডি গুইংগার লেডি
যে পাদ দিয়া মিছাকথা কয়
তার পুটকিত কুড়াল বয়
কুড়ালে বলে বাম বুত
সদা বলে চারুত চুরুত।
গুণতে গুণতে যার ভাগ্যে 'চুরুত', ধরা হয় সে-ই দোষী।
হিন্দু সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা ভূত-পেত্নীর ভয় থেকে বাঁচার জন্যে ছড়া কাটে-
ভূত আমার পুত পেত্নী আমার ঝি
রাম-লক্ষ্মণ সাথে আছে
ভূতে করব কী ?
মুসলিম সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরাও অনুরূপ ছড়া কাটে -
ভূত আমার পুত
পেত্নী আমার ঝি
আল্লাহ্-রাসুল সাথে আছে
করব আমায় কী?
আবার একই ছড়ায় ধর্মনিরপেক্ষতার নির্দশন দেখা যায়-
একটি মায়ের দুইটি সন্তান
এক রথে ঘুরায় হিন্দু-মুসলমান।
কৌতুকপ্রধান ছড়াও প্রচলিত আছে-
॥ ১।৷ অ্যাইচ ছেরা ভের ভেরা
কাঁডলের কোষ
তর মা মরছে
আমার কী দোষ?
।৷২৷। অ্যাইচ ছেরিরে ধর
চুঙ্গার ভিতরে ভর
চুঙ্গা গেছে ভাইঙ্গা
ছেরি দিছে কাইন্দা।
॥ ৩॥ ঠাকুর মাগুর এগার
জাইত্যা ধর পাগার
পাগার গেছে শুকাইয়া
ঠাকুর গেল কিজাইয়া।
কেউ মাথা মুণ্ডন করলে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা ছড়ার মাধ্যমে তাকে ক্ষেপায়-
নাইড়া মাথা পিয়ারী
ডিম পারে অররি
একটা ডিম নষ্ট
পিয়ারীর মার কষ্ট।
এরূপও প্রচলিত আছে-
মাথা চুলা পিয়ারী
এন্ডা পাড়ে ভরভরি
একটা এন্ডা নষ্ট
পিয়ারীর মার কষ্ট।
এক সময় মোহনগঞ্জের হাওর এলাকার রাখলরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে শিরনি সংগ্রহ করার সময় ছড়া পাঠ করত। ওরা বাঘের হাত থেকে গরু-ছাগলকে রক্ষার জন্য বাঘের নামে 'বাঘাই শিরনি' করত। যদিও বর্তমানে বাঘ বা গহীন অরণ্য কোনোটাই নেই।
আইলাম্বর আইলাম্বর
আইলাম রে ভাই মোড়লের বাড়ি
পথ পাইলাম কলার ছড়ি
কলার ছড়ি লড় বড়
ও মোড়ল চোর ধর
চোর ধরিতে ছিক্কা লড়ে
ঝন-ঝইন্যা টেহা পড়ে
উগলা টেহা পাইলাম গো
বাইন্যা বাড়ি গেলাম গো
বাইন্যা তর রূপার মালা
এই ঘরখান দেখতে বালা
ঘর বালা ঘর বালা
ঘর বালা গাড়ুনি
গিত্যাইন বড় রাঁধুনি
ও গিত্যাইন লড় চড়
আমায় দিবে কত ধন
আমি ত মাগিয়া খাই
বাঘের নামে শিরনি চাই
বাঘ গেল নাগাইপুর
কিইন্যা আনল চাম্পাফুল
চাম্পা গায়া পোলাইন রে
কী কী ধান মাগছ রে
আপন ধান মাগিরে
আমি ত মাগিয়া খাই
বাঘের নামে শিরনি চাই।
স্কুল, মাস্টার, ছাত্র ও শ্রেণি নিয়ে ছড়া প্রচলিত আছে। সেগুলোর অধিকাংশই ব্যঙ্গাত্মক। কারণ আগে ছাত্ররা লেখাপড়ায় তেমন আগ্রহী ছিল না। স্কুলপালানো বা পড়া না-শেখার কারণে প্রায়ই তাদেরকে শিক্ষকদের বেতের মার খেতে হতো। শিক্ষকরাও পড়াতে বসে ঘুমোতেন বা পাশের পাড়া ঘুরতে যেতেন। সবকিছু মিলিয়ে ছাত্রছাত্রীদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতো এবং প্রতিবাদের ভাষা তারা ছড়ার মাধ্যমে প্রকাশ করত -
॥১৷৷ এই ইস্কুলে যাইতাম না
বেতের বাড়ি খাইতাম না
বেত গেছে ভাইঙ্গা
মাস্টার দিছে কাইন্দ্যা।
॥ ২৷৷ এই ইস্কুলডা সাদা
ছাত্রগুলি গাধা
বেঞ্চিগুলি সরু
মাস্টারগুলি গরু।
॥ ৩।। এই ইস্কুলডা কালা
মাস্টারগুলি ভালা
বেঞ্চিগুলি তিনফুট
ছাত্রগুলি ভেরি গুড।
॥ ৪।। ইস্কুল যাইতাম না
বেতের বাড়ি খাইতাম না
লাম্বা লাম্বা বেতের বাড়ি
ফুইল্যা উডে তাড়াতাড়ি।
॥৫॥ স্বরই-অ স্বরাই-আ
মাস্ট মশ আরাইয়া।
॥৬॥ এ, বি, সি
মাস্ট মশ পাইছি।
॥৭॥ আলিফ, বে, তে, ছিপারা
মাস্টার গেছে হেই পাড়া।
॥৮॥ ক, খ, গ, ঘ, ঙ
মাস্ট মশ ঘুম।
ওয়ান
ফুলের বাগান (বা, মরা গরু টাইন্যা আন)
টু
খায় খালি পুটকির গু ।
থ্রি
খায় খালি নাকের ঘি (বা, পান,বিড়ি)।
ফোর
গুয়ের টুবলা লইয়া দৌড়।
ফাইভ
কাচারীর নাইব।
সিক্স
খায় খালি কিচমিচ।
সেভেন
ভিক্ষা দিবেন।
বহুল প্রচলিত একটি ছড়া বিশেষ করে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা বলে থাকে। সাধারণত স্কুল বন্ধ থাকলে এ-ছড়াটি তাদের বলতে দেখা যায়।
মামা আইছে ঘাইম্যা
ছাতি ধর নাইম্যা
ছাতির উপরে গামছা
দেখ মামির তামসা
ছোট মামি রান্দে বাড়ে
বড় মামি খায়
মাইধ্যম মামি গাল ফুলাইয়া
বাপের বাড়িত যায়।
বাপে দিল লাখি
পাইল একটা বাতি
বাতিতে নাই তেল
পাইল একটা বেল
বেলে নাই বিচি
পাইল একটা কেঁচি
কেঁচিতে নাই ধার
পাইল একটা হার
হারে নাই লকেট
পাইল একটা পকেট
পকেটে নাই টাকা
ক্যামনে যাইব ঢাকা?
ঢাকাতে নাই গাড়ি
ক্যামনে যাইব বাড়ি?
বাড়িতে নাই ভাত
দিলাম একটা পাদ
পাদে নাই গন্ধ
গাডিস স্কুলডা বন্ধ।
ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা চলাফেরা করতে বা খেলতে গিয়ে মাঝে মাঝে অল্প ব্যথা পায়। বড়োরা তখন তাদের সান্ত্বনা দেবার জন্য ছড়ার মাধ্যমে ঝাড় দেয়।
কসকা ঝাড়া মসকা ঝাড়া
বিলাই হাগে ছড়া ছড়া
কুত্যা হাগে দৈ
এমন ঝাড়া ঝাইরা দিলাম
তর (হউরির) পুটকি ওতি সই।
একই সাথে রোদ ও বৃষ্টি হলে ছেলেমেয়েরা আনন্দে ও বিস্ময়ে বলে ওঠে-
রইদ হইতাছে বৃষ্টি হইতাছে
খেঁকশিয়ালের বিয়া হইতাছে।
কার্তিক মাসে মশার উপদ্রব বেড়ে গেলে ছোটো
ছোটো ছেলেমেয়েরা খড়-খুটো, বাঁশ বা কঞ্চি দিয়ে তৈরি করে ভোলা। ভোলার মুখে মৃত মশা, মাছি, পিঁপড়া, ঢুকিয়ে দেয়। তারপর এর মুখে আগুন দিয়ে আনন্দসহকারে ভোলা হাতে নিয়ে নদী বা বিলের দিকে ছুটতে থাকে এবং সেখানে তা পুঁতে রেখে আসে। তারপর কলার ডগা দিয়ে উপহাসের পাত্রপাত্রীদের পাছায় বা নিতম্বে আস্তে আস্তে আঘাত করে বলে-
ভালা আয়ে বুরা যায়
মশা মাছির মুখ পোড়া যায়।
এখানকার লোকের বিশ্বাস ভোলা পোড়ালে মশা-মাছির বংশ ধ্বংস হয়।
ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা একত্রে খেলাধুলা
করতে গিয়ে প্রায়ই ঝগড়া বাঁধিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। এর একটি প্রতীকী রূপ আছে। তা হলো ঝগড়াকারী দুজনের দুই কনিষ্ঠা আঙুল ধরে জোরে টান মারলেই কথা না-বলার শপথ বা দিব্য হয়ে যায়। ছড়াটি এই-
কেনি আঙ্গুলের রক্ত
কিরা আমার শক্ত।
দুজন সখী মনের আনন্দে বা মনের দুঃখে পাটক্ষেতে বসে দুজনের মনের কথা বলার ছবি ছড়ায় ফুটে ওঠেছে-
সইলো সই নাইল্যা-ক্ষেত বই
নাইল্যা-ক্ষেত বইয়া বইয়া
মনের/দুঃখের কথা কই।
এছাড়াও অসংখ্য ছড়া আছে তাতে বিভিন্ন রকম বক্তব্য ফুটে ওঠেছে।
।। ১৷৷ ডুফিলো ডুফি ধান লাড়ছস কই?
চাইলতা গাছের তলে
হাপের লেংগুর লড়ে
বাঘে ডুক্কার মারে।
আইজ ডুফির তেল তেলানি
কাইল ডুফির বিয়া
ডুফিরে নিত আইব
বরণতলা দিয়া।
বরণতলার ফুল ফোডে
থোকা থোকা অইয়া
ডুলিরা ডোল বাজায়
বেতের শিশ দিয়া
সন্ন্যাসীরা পূজা করে
মইষের মাথা দিয়া।
।৷২৷। আমরা দুটি ভাই
শিবের গাজন গাই
ঠাকুরমা গেছে গয়া-কাশী
ডুগডুগি বাজাই ।
।।৩।। ধন ধন ধন
বাড়িতে ফুলের বন
এ ধন যার ঘরে নাই
তার কিসের জীবন?
।। ৪।। চিকা আয়ে চিক চিকাইয়া
বামুন আয়ে লাডি লইয়া
ধর চিকা মার চিকা
চিকার দাম পাঁচশিকা ।
।।৫।। আগে জমিদার বাড়ি বা বড়ো বাড়িতে জমিদারের তোষামুদে (চেলা) জমিদারের সাথে সব সময় থাকতে থাকতে আর্থিকভাবে বেশ ফুলে-ফেঁপে উঠত। একদিন তাই সে জমিদারের সাথে টেক্কা দিতে চায়। তার এ কাণ্ড দেখে মানুষ
তোষামুদেকে সতর্ক করে দেয় -
পাক্কা বাড়িত চাক্কা ঘুরাইন
বাক্কা দেখি মিঞায়
টেক্কা দিলে ধাক্কা খাইবাইন
মক্কা মদিনায়।
প্রবাদ ও প্রবচন
অনেক আগে থেকেই এখানকার লোকজন প্রবাদ ও প্রবচনের সাথে পরিচিত। প্রবাদ-প্রবচন ব্যবহারে কথায় রসের সৃষ্টি হয়। কথায় যৌক্তিকতা দাঁড় করাতে কিংবা যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে এখানকার লোকেরা প্রবাদ ও প্রবচনের সাহায্য নেয়। প্রবাদের তত্ত্ব ও উপদেশমিশ্রিত রসই হচ্ছে প্রবচন। প্রবাদ ও প্রবচনের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে। সাধারণত প্রবাদগুলো দু লাইনের বেশি হয় না এবং তাতে ছন্দের অস্তিত্ব থাকে না কিন্তু প্রবচনগুলো প্রবাদের চেয়ে দীর্ঘতর ও ছন্দোবদ্ধ হয়। প্রবাদগুলো সমাজের নিয়মনীতি কিন্তু প্রবচনগুলো শিক্ষিত সমাজের জীবনদর্শন। প্রবাদ ও প্রবচন হলো ভাষার অলঙ্কার। ভাটিবাংলার প্রবাদ-প্রবচনের অধিকাংশই বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রচলিত আছে।
১। গরিবের ডাইল ওইলেই মেমানি।
২। সুখের ছোট কুড়ালের কূপ।
৩। বাঁশের চেয়ে কঞ্চি শক্ত।
8। নিজে খাইতে পাই না মসরব ব।
৫। ফোডা গরুর লেংগুর দোষ।
৬। বাড়ির মানুষ বাড়িত নাই
পাড়া-পড়শির ঘুম নাই।
۹۱ পুলিসে ডাকছে চাচি
আমি কী আর ভবে আছি।
৮। হুনছিলাম না হাতে গুতে
হুনাইছে আমার বইন পুতে।
৯। পুটকি ফাইট্যা মুরগি মরে
গিরস্ত কয় ছুডু ছুডু আণ্ডা পাড়ে।
১০। আড়ে কইলে ঠারে বুঝে
ভাঙ্গাইয়া কইলে বলদেও বুঝে।
১১। জাতের মেয়ে কালাও বালা
গাঙ্গের পানি ঘুইল্যাও বালা।
১২। যার রান্দা খাই নাই
হে বড় রান্দুনী
যারে কোনোদিন দেহি নাই
হে বড় সুন্দরী।
১৩। ঠেকছিলাম যেইখান
শিখছিলাম সেইখান।
১৪। দুধ-ভাত ছাড়া যায় বন্ধু ছাড়া যায় না।
১৫। খালি মোডা অইলেই দারগা অয়ন যায় না।
প্রবাদ-প্রবচনের শব্দার্থ
-------------------------------
১। ডাইল-ডাল, ওইলেই-হলেই,
মেমানি-অতিথি আপ্যায়ন
8। মসরব-কোনো ব্যক্তিকে উপমা হিসেবে
ব্যবহার করা, ব-বস
৫। ফোডা-ত্রুটি, লেংগুর-লেজ
۹। ভবে-পৃথিবীতে
৮। হুনছিলাম-শুনেছিলাম, বইন-বোন ফ্যাইট্যা-ফেটে, গিরস্ত-গৃহস্থ, ছুডু-ছোটো
১০। আড়ে-ইশারায়, ঠারে-চালাকে, বলদেও-বোকাও
১১। বালা-ভালো, ঘুইল্যাও-ঘোলাও
১২। রান্দা-রাঁধা, রান্দুনী-যে রাঁধে, হে-সে
১৫। মোডা-মোটা, অয়ন-হওয়া।
ছড়ার শব্দার্থ
------------------
ফুলগুটি খেলা : সারি-সারা, গেছ-শেষ, পাট্টি-পালা
থাপড়ি খেলা: থাপ্পি-থাপড়ান, গুডি-গুটি, হরু-সর্ষে
লুকোচুরি খেলা : চোউখ-চোখ,
পলান্তি-পলানো, কাডি-কাঠি
গাচ্ছ্যা ও বাঘ খেলা : গাচ্ছ্যা-যে গাছে চড়ে, মাডির-মাটির, তরা-তোরা, ছৈতাল্লে-ধরতে
পারলে
হাডুডু খেলা : ৩॥ চুটে-আঘাতে,
তউরাল-তলোয়ার । ৪।। নাইচ্যা-নেচে
৫॥ ডাগগুয়া-ডগা, আগগুয়া-এগিয়ে আয়
৬॥ নাইরকল-নারকোল ৭॥ কুবে-কোপিয়ে, আগ-শীর্ষ ৮।। উপ্ রে-উপরে, চাইয়া-চেয়ে
১০।। ধইরা-ধরে, মুতি-প্রস্রাব করি
১২। মাইনকার-গালি অর্থে ব্যবহৃত বা নামবিশেষ।
গুংগিল-হাঁটুর উপর, গুংগি-আরোহী,
বউগ্ লা-বক, বাইরাইতা-আঘাত করা, ফারচনা-পার না, উইলল্যা-হুলো,
বিলাই-বেড়াল, হউরের-শ্বশুরের
১।। কতা-কথা, গু-পায়খানা/মল, ২॥ বাইদ্যা-বেদে, ৩।। কেডা-কে, 8।। গুইও-পায়খানায়, পাড়া-নোড়া, চাডা-চাটা, ৬॥ গুডা-পায়খানা, তুইল্যা-তুলে
৯॥ চিক-ভাঙা কলসির টুকরা, ১২॥ গাতা-গর্ত, মাইনষের-মানুষের, আতা-হাত দেওয়া, ১৩। দেউরি-উঠান, হউরি-শাশুড়ি, ১৫।। লড়ে-নড়ে, ছের ছেইরা-ছড়িয়ে ছড়িয়ে, মুহ-মুখে, পাদ-অপানবায়ুত্যাগ (বাতকর্ম)
কাঁডলের-কাঁঠালের, ভের ভেরা-নষ্ট-পচা ছেরা-ছেলে, ছেরি-মেয়ে, ভাইঙ্গ-ভেঙ্গে, কাইন্দা-কেঁদে, পাগার-ভাগাড়, জাইত্যা-চেপে ধরা।
কিজাইয়া-চোখ-মুখ উলটে মরার অবস্থা, নাইড়া-মাথা মুণ্ডন (মাথার চুল সম্পূর্ণ ফেলে দেওয়া), অররি-অনেকগুলো, পিয়ারী-এর মেয়ের নাম, এন্ডা-ডিম
টেহা-টাকা, এগলা-একটা, বাইন্যা-ব্যবসায়ী (বণিক)
আরাইয়া-হারিয়ে যাওয়া, হেই-ঐ, টুবলা-বোঁচকা
ঘাইম্যা-ঘেমে, নাইম্যা-নেমে, মাইধ্যম-মধ্যম, বাততি-বাতি, পাদ-অপানবায়ুত্যাগ, গাডিস
স্কুলডা-গার্লস স্কুলটা।
বিলাই-বেড়াল, হাগে-পায়খানা করে, কুত্যা-কুকুর, হউড়ি-শাশুড়ি, রইদ-রোদ।
ভালা-ভালো, বুরা-মন্দ/খারাপ
কেনি আঙ্গুল-কনিষ্ঠা আঙুল, কিরা-দিব্য, নাইল্যাক্ষেত-পাটক্ষেত, বইয়া বইয়া-বসে বসে।
লাড়ছস-নেড়েছস, হাপের-সাপের,
লেংগুর-লেজ, লড়ে-নড়ে, ডুক্কার-চিৎকার আইজ-আজ, কাইল-আগামী কাল,
আইব-আসবে, ফোডে-ফোটে, অইয়া-হয়ে, ডুলিরা-যারা ঢোল বাজায়, ডোল-ঢোল, মইষের-মহিষের।
টুকাইতে-কুঁড়াতে, চিকা-ছুঁচো (প্রাণী), চিক চিকাইয়া-চিক চিক শব্দ করে আসা।
পাক্কা-পাকা, চাক্কা-চাকা, বাক্কা-বেশ ।
-।-
ভাটিবাংলার দ্বারপ্রান্ত মোহনগঞ্জ থেকে ছবিটি তুলেছে অনুপম রায়।